Saturday 01 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English.

সেমিনারে বক্তারা / শিক্ষাখাতে সরকারের প্রতিশ্রুতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২২ মে ২০২৬ ০০:৩৯

ঢাকা: সরকার এক শিক্ষক-এক ট্যাব, ফ্রি ইউনিফর্ম এবং আরও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং বর্তমানে আমাদের শিক্ষিত বেকার একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রথম সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটির উদ্যোগে ‘শিক্ষা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান’ শিরোনামে এই সেশনটি আয়েজিত হয়। আলাউদ্দিন মোহাম্মদের সঞ্চালনায় এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন আবদুল্লাহ আল আমিন, এমপি এবং সহ-সভাপতি হিসেবে ছিলেন নুসরাত তাবাসসুম, এমপি। সেশনে যুগ্ম সদস্য সচিব আকরাম হুসাইনসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সেশনে বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ.কে.এম ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব ৫ শতাংশের কম, যা এক দৃষ্টিকোণ থেকে খারাপ নয়। কিন্তু মূল পার্থক্য হলো আমাদের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব এবং আমাদের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট পড়াশোনা শেষ করে ৩-৪ বছরের মধ্যে কোনো চাকরি পায় না। বাংলাদেশে প্রতিবছর চাকরির বাজারে ২০ লাখ লোক প্রবেশ করে এবং সেখানে ৭ লাখ লোক গ্র্যাজুয়েট।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কলেজ করে এটি বাড়িয়েছে, মার্কেটে যার চাহিদা নেই। আমাদের যারা গ্র্যাজুয়েট, তারা তো শ্রমিকের কাজ করতে চায় না এবং তাদের সুযোগ দিতে হবে। ঢাকা শহরের ১৫ লাখ রাইডারদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষিত এবং যারা রাইড শেয়ার করে এদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ শিক্ষিত।

তিনি বলেন, তেল সংকটের সময় একজন মন্ত্রী বললেন যে, আমাদের তরুণরা তেল মজুত করে, অথচ তার ধারণাই নেই যে আমাদের ৫ থেকে ৬ লাখ তরুণ এই রাইড শেয়ার করে নিজেদের ঘর চালায়। তিনি বলেন, সরকার এখন ১২০ সিসির ওপরের গাড়িতে ২ হাজার টাকা অগ্রিম কর দিতে চাচ্ছে এবং আমাদের পলিসিমেকারদের এখানে কাজ করা উচিত যে কারা বেকার এবং কাদের ওপর কর বসানো উচিত না।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা মালিক সমিতির সভাপতি আলী জামান বলেন, আমাদের ট্যাক্স-জিডিপির রেশিও ৬.৬ শতাংশ এবং আমার মনে হয় এটা বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট ভালো। মানুষ সরকারকে যে কর দিচ্ছে, তা সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেবে, কিন্তু কোনো সরকার এটা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এখন বাজেটে কর আয় করাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ বাজেট একটা ভিশনারি জিনিস।

তিনি আরও বলেন, সারাবছর তারা এসআরও তৈরি করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন নতুন ট্যাক্স বসায় এবং যেকারণে মানুষ মনে করে ট্যাক্সের খাতায় নাম লেখানো মানেই গিলোটিনে মাথা দেওয়া। নতুন করদাতা সৃষ্টি হচ্ছে না এবং যে ট্যাক্স দিচ্ছে তার ওপরই নতুন ট্যাক্স আরোপ করা হচ্ছে।

শেয়ার বাজারের বিষয়ে তিনি বলেন, আগে যেসব কোম্পানি যেমন ইউনিলিভার বাংলাদেশে এসেছে, তারা যখন কোম্পানি খেয়ে ছোগলা করে ফেলেছে, তখন সেটা জনগণের কাছে বিক্রির জন্য শেয়ার বাজারে এনলিস্টেড করেছে। তিনি আরও বলেন, শেয়ার মার্কেট ৩ মাসের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, কর্মসংস্থানের বিষয়টি শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, এক বছর শিক্ষার পেছনে ব্যয় করলে ব্যক্তির আয় ৮ থেকে ৯ ভাগ বাড়ে, কিন্তু বাংলাদেশে যুবকদের মধ্যে যোগ্যতা অনুযায়ী ৮৫ ভাগ লোক চাকরি পায় না। আমাদের বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপির মাত্র ১.৬৯ ভাগ ব্যয় করা হয়েছে, যেখানে জাতিসংঘ ৬ ভাগ ব্যয় করতে বলে। আজকে পঞ্চম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে এবং আমাদের গত বছরের বাজেটে সুদ পে করেছি ১৫ শতাংশের বেশি।

তিনি বলেন, আমরা যদি ঋণ না নেই, তাহলে আমরা উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করতে পারব না এবং এখানে আমরা আউটসাইড দ্য বক্স চিন্তা করতে পারি। জাকাত নিয়ে রিয়েলিস্টিক কাজ ১৯৯১ সালের পর হয়েছে কি না তা জানা নেই। সাহাবুদ্দিনের সময় অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশে ৬ হাজার কোটি টাকা দরকার এবং তখন ব্যাংকিং খাত থেকে হিসেব করা হয়েছিল যে, জাকাত থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, কোনো নির্বাচিত সরকার শিক্ষা নিয়ে এত উদ্দীপনা আগে দেখায়নি এবং জিডিপির ৫ ভাগ বাজেট করতে হবে, যা ডলারে ২৫ বিলিয়নে দাঁড়ায়, যেখানে আমাদের এখনকার বাজেট ৮ বিলিয়ন ডলার। সরকার ইতোমধ্যে তাদের নির্বাচনি ইশতিহারে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে এক শিক্ষক-এক ট্যাব, ফ্রি ইউনিফর্ম দেওয়া ও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হবে, কিন্তু আমাদের শিক্ষাখাতের যে চ্যালেঞ্জ সেই অনুযায়ী উনাদের পলিসি এজেন্ডা সাজানো হয়নি।

তিনি বলেন, এখানে আমাদের খরচ করার ক্ষেত্রে বিরাজনীতিকীকরণ করতে হবে এবং যে ধরনের প্রমিস করা হয়েছে সেগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। তিনি আরও বলেন, আমাদের পঞ্চবার্ষিক মহাপরিকল্পনায় এবছরকে বলা হয়েছে স্ট্যাবিলাইজেশন অ্যান্ড রিকভারি এবং এ বছরের বাজেটটা হবে ২০৩৪ এর ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির ফাউন্ডেশন। ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির জন্য যেই মানব সম্পদ দরকার তা এখান থেকে তৈরি হবে এবং আমাদের প্রায়োরিটি হওয়া উচিত প্রাথমিক ও আর্লি স্টেজের শিক্ষায়, তাহলেই আমরা পরের ধাপে যেতে পারব।

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ আরও বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ‘রেমিডিয়াল এডুকেশন’ বা শিখন ঘাটতি পুনরুদ্ধার এবং প্রাক-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করা। বৃত্তিমূলক ও মাদরাসা শিক্ষাকে কেবল সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে না দেখে মূলধারার সমান মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। বর্ধিত বাজেটের সঠিক ব্যবহার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ‘পারফরম্যান্স মনিটরিং ইউনিট’ গঠন করা যেতে পারে, যা অপচয় ও অপব্যবহার রোধে ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, এছাড়া করপোরেট খাতের সহায়তায় একটি ‘শিক্ষা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে। ১৯ শতকের মানের শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ২১ শতকের প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এবং যেকোনো সংকটেও শিক্ষা বাজেটকে স্পর্শ না করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে পরিচালনা করাই এখন সময়ের দাবি।

সভাপতির বক্তব্যে আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবে ধূমপান নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু সংসদে একটি আইন ২ ঘণ্টা আগে দিয়ে বলল সংশোধন আছে এবং সেখানে আইনে ইলেকট্রনিক সিগারেট বৈধ করে দেওয়া হচ্ছে, যা আমরা পাশ করে ফেলছি গায়ের জোরে। আমাদের পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেখলে মনে হয় রাষ্ট্র জনগণকে বিশ্বাস করে না, বরং তার কিছু অলিগার্কদের বিশ্বাস করে।

তিনি বলেন, তারা যতই ঋণখেলাপি হবে তাদেরকে নির্বাচনের সুযোগ দেবে, কিন্তু যারা তরুণ উদ্যোক্তা তাদের জন্য ঋণের বেলায় নানা ধরনের অবস্টাকল দেওয়া হয়। এই বাজেটে পরিকল্পনা আসছে ১২০ সিসির বাইকের ওপর ২ হাজার টাকা কর দিতে হবে, কিন্তু তারা জানে না যে বাইক এখন আর কোনো বিলাসী দ্রব্য নয়। বাইক শেয়ার করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে তাদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও তরুণ এবং তাদেরকে করের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এটা থেকে আমরা কীভাবে বের হতে পারি সেই চেষ্টা আমরা করছি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর