Saturday 01 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English.

রংপুরের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ নেই, বাড়ছে মাতৃমৃত্যু

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১২ মে ২০২৬ ১২:৫৪

রংপুর: ওষুধের অভাবে রংপুর বিভাগের ২ হাজার ৯৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যত ‘পরামর্শকেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে বন্ধ ওষুধ সরবরাহ। গর্ভবতী মায়েরা আয়রন-ক্যালসিয়ামের অভাবে পড়েছেন, বাড়ছে দরিদ্র রোগীদের ভোগান্তি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়বে।

রংপুর নগরী ও বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার সূত্র জানায়, ওষুধের অভাবে ক্লিনিকগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। রোগী আসছে কম, আর যারা আসছেন তারা ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাধ্য হয়ে ‘কাউন্সেলিং’ করে রোগীদের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রান্তিক-এ মানুষজন বাধ্য হয়ে উপজেলা ও জেলা শহরে ছুটছেন, বাড়ছে তাদের চিকিৎসা ব্যয় ও সময়ের অপচয়।

বিজ্ঞাপন

ওষুধ ফুরালো চার মাসে, বাড়ল দুর্ভোগ

বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয় সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরেই কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সংকট দেখা দিচ্ছিল। শুরুতে ৩০ পদের ওষুধ দেওয়া হলেও, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তা কমে ২৭ পদে নামে। পরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ২২ পদে। এরই মধ্যে গত বছরের অক্টোবরে কিছু ওষুধ এলেও, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই সব ফুরিয়ে যায়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রহরে এখনও ওষুধ আসেনি।

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মা ও শিশু

এই সংকট সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে গর্ভবতী মা ও শিশুদের। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোই ছিল তাদের গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবার প্রথম ভরসা। কিন্তু আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও ক্যালসিয়ামের অভাবে মায়েরা পুষ্টি পাচ্ছেন না। এতে রক্তশূন্যতা, দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও প্রসবজনিত জটিলতা বেড়েই চলছে। রংপুর নগরীর পূর্ব ঘাঘটপাড়া এলাকার অন্তঃসত্ত্বা বানু আক্তার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘চারবার চেকআপ করাইছি। আয়রন ট্যাবলেট আর ক্যালসিয়াম ঠিকমতো পাই নাই। পরে ফার্মেসি থেকে কিনতে হইছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ওষুধ নয়; গর্ভকালীন জটিল মাতৃমৃত্যু ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সেবাও বন্ধ রয়েছে। জরুরি প্রসূতি সেবা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকায় মাতৃস্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

‘কাউন্সেলিং’ ছাড়া হাতে কিছুই নেই

এ তো গেলো নগরীর মধ্যে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকের চিত্র। এবার নগর থেকে বাইরে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আরাজিনিয়ামত কমিউনিটি ক্লিনিকেও একই দুর্দশার এই চিত্র যেন সবার চোখে ধরা পড়ছে। রোগীর ভিড় থাকলেও ওষুধের তাকগুলো ফাঁকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, ‘আগে রোগীরা এসে ওষুধ নিয়ে যেত। এখন আমরা শুধু বুঝাই, কী খেতে হবে, কোথায় যেতে হবে। মানুষ রাগ করে, কিন্তু আমাদের হাতেও কিছু নাই।’

শুধু ওষুধই নয়; কমিউনিটি ক্লিনিকের চিত্র যেন পুরো গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার দর্পণ। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বহু জায়গায় টিকাদান কার্যক্রম (ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন ও ডিওয়ার্মিং) ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারগুলো (ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপের চিকিৎসা কেন্দ্র) কার্যত বন্ধ। জটিল রোগী বহনের অ্যাম্বুলেন্স নেই, জরুরি বিভাগগুলো জরুরি সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা খালি হাতে ফিরছেন

উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন। নিয়মিত ওষুধ না পেয়ে তারা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় দিন যাপন করছেন। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশের জন্যই দায়ী উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগ (এনসিডি)। অথচ স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২ শতাংশ বরাদ্দ এই খাতে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ডা. মো. এনামুল হক স্বীকার করেছেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিশ্চিত করতে বাজেট বাড়ানো জরুরি।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট : শুধু ওষুধ না, কাঠামোয় ফাটল

সংকটটি শুধু ওষুধ সরবরাহে গরমিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি যেন গোটা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার চিত্র। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালের মতো সরকারি স্থাপনার একটি বড় অংশ অকেজো পড়ে আছে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা বেলাল আহমেদের ভাষায়, ‘কমিউনিটি ক্লিনিক শুধু ওষুধ বিতরণের জায়গা নয়; এটি মাতৃস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র, শিশুর টিকাদান কেন্দ্র। এখন ওষুধ হীনতায় সেই কাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে।’

দৃষ্টান্ত হিসেবে রংপুর শিশু হাসপাতালের কথা বলা যায়। ছয় বছর আগে সাড়ে ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ শয্যার এই হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হলেও, স্টাফ ও সরঞ্জামের অভাবে এটি এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি।

সমাধান তো নেই, দায়ও নেই স্বাস্থ্য বিভাগের

রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ আসে সরাসরি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অফিসে। তারাই গ্রহণ করেন। এরপর সেখান থেকে সরাসরি চলে যায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে। সেখানে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি থাকে। কমিটির উপস্থিতিতে ওষুধের কার্টন খোলা হয়। ফলে সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের খুব একটা তদারকি থাকে না।

এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ( ভারপ্রাপ্ত) ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, এক সময় বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক এটা দেখভাল করতো। এখন সেগুলো ট্রাস্টের অধীনে চলে গেছে। উপজেলায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দেখাশুনা করেন।

 

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর